আষাঢ়ের কালো মেঘ
বাইরে বৃষ্টির শব্দে চারদিক অন্ধকার। অবিরত বৃষ্টি আর বিদ্যুতের ঝলকানি। মিতুর চোখে-মুখে চিন্তার রেখা। এই তো অয়নের অফিস থেকে ফেরার সময়। ক্ষণে ক্ষণে ছোট ছেলে সজীব বারবার মিতুর কাছে এসে "বাবা কই" বলে কাঁদতে শুরু করেছে। সজীব বজ্রপাতে ভীষণ ভয় পায়। শুধু সজীবই নয়, মিতু নিজেও বজ্রপাতের শব্দ শুনলে আঁতকে ওঠে। যতবার বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, ততবার মিতুর বুক ধড়ফড় করে উঠছে। সে বারবার ছাতা মাথায় দিয়ে গেটের সামনে ছুটে যাচ্ছে আর ফিরে আসছে। অয়নকে না দেখা পর্যন্ত তার মনে কোনো স্বস্তি নেই। এক অজানা ভীতি তার বুকের ভেতর বাসা বেঁধেছে।
মিতুর স্বামী ছাড়া এই দুনিয়ায় আর আপন কেউ নেই। বাবা-মা অনেক আগেই তাকে ত্যাজ্য করেছেন। এমন এক বর্ষার দিনেই মিতু আর অয়নের পরিচয় হয়েছিল। সেই পরিচয় থেকেই দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর প্রণয়। চিন্তার ভাঁজ কপালে নিয়ে জানালা ধরে দাঁড়িয়ে আছে মিতু। রিমঝিম বৃষ্টি দেখছে, আর পুরনো স্মৃতিগুলো বৃষ্টির জলের মতোই ভেসে আসছে মনের পর্দায়। সেই প্রথম দিনের কথা মিতু কিছুতেই ভুলতে পারে না।
সেদিনও আকাশ মেঘে ছেয়ে গিয়েছিল। মিতু প্রাইভেট পড়ে বাড়ি ফিরছিল। বৃষ্টির আশঙ্কায় দ্রুত পা ফেলে হাঁটছিল সে, কারণ তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ছাতাটা সাথে আনতে ভুলে গিয়েছিল। এমন সময় অয়ন দূর থেকে মিতুকে দেখল। অয়নও তখন টিউশনি শেষ করে একই সময়ে বাড়ি ফিরছিল। হঠাৎ মিতুর দিকে চোখ পড়তেই দেখল কেবল দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়েছে, আর মিতু বুঝতে পারছে না এই অবস্থায় কী করবে। অয়ন নিজের ছাতাটা তার দিকে এগিয়ে দিল। মিতু মাথা নিচু করে উত্তর দিল, "ধন্যবাদ, আমার ছাতা লাগবে না।" অয়ন বলল, "তা কী করে হয়? আপনি তো ভিজে যাচ্ছেন। কোথায় যাবেন?" মিতু উত্তর দিল, "ধোলাই গ্রাম।" অয়ন অবাক হয়ে বলল, "আরে, আমিও তো ওদিকেই যাব! আমার বাড়ি শমসেরপুর, আপনার পরের গ্রাম। এখনও অনেকটা পথ বাকি, চলুন একসাথেই যাওয়া যাক।"
তারপর অয়ন মিতুকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। হাঁটতে হাঁটতে দুজনের পরিচয় পর্ব শেষ হয়। মিতু অয়নের দিকে লাজুক চোখে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল—বেশ মিষ্টি তো ছেলেটা! মৃদু বৃষ্টির ছোঁয়া লাগছিল মিতুর গায়ে। অয়নও মাঝে মাঝে চুরিকরে মিতুকে দেখছিল। কথা বলতে বলতে মিতুর বাড়ি চলে এলো। মিতু ইশারা করে বলল, "ওই বাড়িটা আমাদের। আসুন, এক কাপ চা খেয়ে যান।" অয়ন হাসিমুখে বলল, "ঠিক আছে, অন্য আরেকদিন খাওয়া যাবে।" এই বলে সে দ্রুতপায়ে হেঁটে চলে গেল। মিতু অপলক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল।
অয়ন তখন অনার্সের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিল। কলেজ শেষ করে দুটো টিউশনি করে বাড়ি ফিরত সে। অয়ন ছিল প্রচণ্ড মেধাবী, সুদর্শন এবং আত্মপ্রত্যয়ী। সংসারে আপন বলতে তার কেউ ছিল না। তার বাবা ছিলেন একজন হতদরিদ্র কৃষক। অয়ন যখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে, তখন এক আষাঢ়ের বর্ষায় মাঠ থেকে কোমর সমান জল ঠেলে গরু আনতে গিয়ে তার বাবা-মা দুজনেই বজ্রপাতে মারা যান। তারপর থেকেই একা একাই জীবনের সাথে সংগ্রাম করে চলেছে সে। জীবনের কাছে তার প্রত্যাশা অনেক, চোখে মুখে অনেক স্বপ্ন। কখনো হার মানতে শেখেনি অয়ন।
এর পর থেকে মিতু ও অয়নের মাঝে মাঝেই দেখা ও কথা হতো। এভাবে দেখতে দেখতে তাদের সম্পর্কের পাঁচ বছর কেটে গেল। অয়নের মাস্টার্স পরীক্ষার ফল বের হলো—সে প্রথম শ্রেণী পেল। এরপর সে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগ দিল। অয়ন মিতুর বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলে মিতুর বাবা তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন। মিতু এই অন্যায় সহ্য করতে না পেরে বাড়ি থেকে পালিয়ে অয়নের কাছে চলে আসে। অয়নের এক চাচা কাজী ডেকে তাদের বিয়ে দেন। এই কথা শোনার পর মিতুর বাবা মিতুকে আর কখনো মেনে নেননি, চিরকালের জন্য ত্যাজ্য করেন।
বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে মিতু স্মৃতির ডায়েরির পাতা উল্টাতে থাকে। তার দু চোখ বেয়ে জল ঝরতে থাকে। আজ তার বাবা-মাকে খুব বেশি মনে পড়ছে। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ খেয়াল করল সন্ধ্যা নেমে গেছে, কিন্তু অয়ন এখনো ফেরেনি। সে অস্থির হয়ে ওঠে এবং জোরে জোরে কাঁদতে থাকে। বুকের ভেতর কোনো এক অশুভ সংকেত বেজে ওঠে। কোনো কিছুতেই মন বসছে না মিতুর।
আস্তে আস্তে বৃষ্টি থেমে যায়। কালো মেঘের দাপাদাপি আর নেই। সমস্ত আকাশ যেন স্থির ও নির্বাক। কী ঘটে যাচ্ছে মিতুর জীবনে? মিতু ফোনের পর ফোন দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ রিসিভ করছে না। ভয়ে সে আরও আঁতকে ওঠে। কিছু হয়নি তো অয়নের? কত জায়গায় খবরাখবর নিল, কিন্তু কোথাও অয়নের সন্ধান মিলল না। রাত যত গভীর হয়, মিতুর বুকের কাঁপন তত বাড়ে। ডাহুক পাখির ডাক শুনে তার বুক দুরুদুরু করে ওঠে। কোনো শুভ সংবাদ আসে না। দু চোখে ঘুম নেই, ছেলেকে জড়িয়ে ধরে সারা রাত কাঁদতে থাকে সে। রাত যেন আর শেষ হতে চায় না। একী কালরাত তার জীবনের সব সুখ কেড়ে নিতে এলো?
ভোর না হতেই মিতুর ফোনটা বেজে উঠল। ফোনটা রিসিভ করতে গিয়ে তার হাত কাঁপছিল। মনের সব জোর খাটিয়ে সে রিসিভ করল। ওপার থেকে একটা অচেনা কণ্ঠ ভেসে এলো, "আপনি কি মিতু?" মিতুর গলা ভয়ে কাঁপছিল, তোতলাতে তোতলাতে বলল, "জি, কী হয়েছে? কোনো খবর পেয়েছেন?" ওপার থেকে বলা হলো, "পথের ধারের একটা গাছে বজ্রপাত হয়েছিল। এই লোকটি সেই বজ্রপাতেই মারা গেছেন।"
মিতুর হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল। ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে আবার শুরু হলো আষাঢ়ের অঝোর ঢল। মিতু নিথর, শূন্য চোখে তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে।
0 Comments