একুশের প্রীতি
বি এম মিজানুর রহমান
নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার কোটাকোল গ্রামের একটি স্কুলের স্মৃতি আজো খুব মনে পড়ে।স্কুলটির নাম কে ডি আর কে মাধ্যমিক বিদ্যালয়। স্থানীয় ওই স্কুলটির নামকরণ চারটি গ্রাম কোলা দিঘলিয়া রায়পাশা কোটাকোল গ্রামের আদ্যাক্ষর নিয়ে গঠিত হয়েছে। চারটি গ্রাম শুধু নয়,পার্শ্ববর্তী সকল গ্রামের শিক্ষার্থীদের দ্বারা মুখরিত ছিলো আমাদের স্কুল ক্যাম্পাস।কো- কারিকুলার একটিভিটিতে দারুন লাগতো সহপাঠীদের অংশগ্রহণ। বিশেষ করে চাঁদা তুলে একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করার সময়গুলো।
আমার খুব মনে পড়ছে মালার কথা।মিষ্টি মেয়ে মালা যে একুশের দিন অ আ ক খ বর্ণের মালা পরিহিত শাড়ি পরে তার আঁচলে সেদিন আমাকে বেঁধেছিলো।প্রথম দেখার ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়!
আমি ছিলাম দূরন্ত প্রকৃতির। যদিও ভালো স্টুডেন্ট হিসেবে সুনাম ছিল।তথাপি আমার দুষ্টুমি শিক্ষকদের চোখের আড়াল ছিল।কাগজ কেটে সাদা ফুল,দড়ি টানিয়ে রঙের কাগজ ময়দা গুলিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারীর আগের দিন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আমরা কয়েকজন প্রতি বছরই করতাম।কলাগাছ কেটে গেট তৈরি করে মেহগনির ছায়াঘন করতাম।রাতে পিকনিক করতে স্কুলে থাকার মজাই আলাদা।স্কুলের ডাবগুলো যেন ডাগর ডাগর চোখে আমাদের দিকে চেয়ে থাকতো! বলতো,আমাকে খাও,আমি খাদ্য পানি নিয়ে বসে আছি!! চুরি বিদ্যা মহা বিদ্যা,যদি না পড়ো ধরা।তবে হ্যা,ডাবকে উঁচু করে তৃষ্ণা নিবারণ থেকে ফগল চুরি করার আনন্দ নেহাত মন্দ ছিলো না।এবারের ফুল চুরি ছিলো মালাদের বাড়ি।নতুন বাড়িটিতে আমি প্রথমবারের মতো আসলাম।আসলে সোনাদহের এ দিকটা আমার খুব একটা আসা হতো না।
রক্ত গাঁদা ফুলের সমারোহ দেখে বাড়িটার প্রতি আমার ভালোবাসা জন্মে গেল।ভাবলাম বাড়িটি এতো পরিস্কার, না জানি এ বাড়ির মেয়েরা কতো না ভালো! আসলে ফুল চুরির শেষে বারান্দার চালের কাছে একটা মিষ্টি গোলাপ আমার নজর এড়ালো না।কাঁচি দিয়ে ফুলটির বোটা কাটতে যেয়ে বিপত্তি। টিনের শব্দ। চোর!চোর!! ফুল চোর...
দৌড়ে প্রাণ বাঁচানোর ভয়টা আজো মনে আছে।মিষ্টি একটি মেয়ের চোর চোর বলাতে পাড়ার কুকুরও যে এতো ক্ষিপ্র হবে ভাবতে পারি নি।
সকালের সমাবেশের পর,মালাসহ ওর কিছু বান্ধবী একুশের শাড়ি পড়া আর আমার বন্ধুদের একুশের আড়ং ফতুয়া সবার চোখে আমাদের আলাদা করছি।ডিএসএলআর ক্যামেরায় ধারণকৃত ছবি আজো স্মৃতি বহন করে।মালার প্রতি দূর্বলতা ভেতর থেকে অনুভব করি।প্রভাতফেরিতে দুই লাইনে ওর পাশাপাশি থাকি।বুঝতে পারি আমার দুই বছরের জুনিয়র খুলনা থেকে আসা মেয়েটিও আমাকে পছন্দ করে।চুলের খোঁপায় রক্ত গাঁদ ফুলেল মেয়েটি আসলে আমার নজর কেড়েছিলো।মিলাদের পর জিলাপি সিংগাড়া তাকে একটু বেশিই দিলাম।মালা একটা মুচকি হাসি দিলো।ওর হাসির বিশেষত্ব আজো বুঝি নি।
বন্ধুদের জড়াজড়িতে আমি মালাকে গোলাপ ফুলটি দিতে গেলাম।প্রেমের তুলসি গাছে নাকি একটু জল ঢালতে হয়! " ও,তুমি তাহলে সেই ফুল চোরা!আমার গাছের ফুল চুরি করেছো আর এখন মন চুরি করতে চাও?তবে রে..."
এতোটা আপনভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি মালা আমাকে পাকড়াও করেছিলো যে আজো সে বাঁধন অমলিন।একুশের স্মৃতিতে তুমি অমলিন আমার মালা,যদিও এদিনটা আমার বুকে বাড়ায় ভাই হারানোর জ্বালা।
0 Comments