সাম্যভিত্তিক সমাজ গড়তে রাষ্ট্র ও জনগণের ঐক্য দরকার ।। বিপুল চন্দ্র রায়

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রাণশক্তি হলো সাধারণ মানুষ। রাষ্ট্র মূলত একটি সামাজিক চুক্তি, যেখানে নাগরিকরা নিজেদের সুরক্ষা, অধিকার ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্যেই একটি শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলে। তাই রাষ্ট্র, আইন কিংবা রাজনীতির মূল কেন্দ্রে জনগণের স্বার্থ থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবতার চিত্র বড্ড করুণ। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার মানসিকতা আর রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির কারণে আজ রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের গভীর দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যা আমাদের জন্য অশনিসংকেত।

 

রাজনীতির মূল কথা ছিল জনকল্যাণ ও সামাজিক ন্যায়বিচার। কিন্তু রাজনীতি যখন কেবল ক্ষমতা দখল বা চেয়ার আঁকড়ে রাখার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়, তখন সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের দুঃখ-কষ্ট আরও বেড়ে যায়। জনগণ যখন দেখে দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা নীতিনির্ধারণে নিজেদের কোনো ভূমিকা নেই, তখন মানুষ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অন্যদিকে, রাষ্ট্রের হওয়ার কথা ছিল জনগণের সেবক। কিন্তু আমলাতন্ত্রের জটিলতা আর ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে সেই রাষ্ট্রই এখন যেন এক নিয়ন্ত্রক। একটি সাধারণ জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন কিংবা পাসপোর্ট বানাতে গিয়ে যখন লাইনে দাঁড়িয়ে হয়রান হতে হয়, তখনই টের পাওয়া যায় রাষ্ট্র আমলাতন্ত্রের জালে কতটা বন্দি। কথা বলার স্বাধীনতা কমে যাওয়া কিংবা নাগরিক সেবার নামে এই ভোগান্তি মানুষ আর সরকারের দূরত্বকে দিন দিন বাড়িয়ে দিচ্ছে।

 

বিচারব্যবস্থার দিকে তাকালেও একই হতাশার ছবি চোখে পড়ে। "আইনের চোখে সবাই সমান" কাগজে-কলমে লেখা এই নীতি যখন বাস্তবে দেখা যায়, তখন মানুষের শেষ ভরসাস্থলটুকুও আর থাকে না। আইনের শাসন কি সত্যিই সবার জন্য সমান? যখন কোনো প্রভাবশালী অপরাধ করলে ফাইল চাপা পড়ে, অথচ সাধারণ মানুষের ছোটখাটো ভুলেও আদালতের চত্বরে জীবন পার হয়ে যায়, তখন প্রশ্ন মনে জাগে? আইন যেন সেই মাকড়সার জাল।যেখানে কেবল ছোট ছোট মাছিগুলোই আটকে যায়, আর বড় বড় রুই-কাতল অনায়াসে জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যায়। আইন তখন সুরক্ষার বদলে সাধারণ মানুষের  জন্য দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

 

তবে সব দোষ কেবল ব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে দিলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। একটি সুষ্ঠু সমাজ গড়ে তুলতে নাগরিকদেরও সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। আইন মেনে চলা এবং সামাজিক নিয়মনীতি বজায় রাখায় প্রত্যেকের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কখনোই পরিবর্তন সম্ভব নয়। রাষ্ট্র ও সরকার টিকে থাকে কেবলই মানুষের কল্যাণে। তাই রাজনীতিকে ক্ষমতার মোহ থেকে বের হয়ে এসে জনমুখী ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন করা দরকার। শাসনব্যবস্থাকে নাগরিকবান্ধব করা এবং সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা আজ জনগণের সবচেয়ে বড় দাবি। রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক অংশীদারিত্ব গড়ে উঠলেই কেবল একটি বাসযোগ্য ও সাম্যভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

Post a Comment

0 Comments