শিরোনম: ভুলের স্বাদে এক বাটি সুখ লেখিকা: নন্দিনী লুইজা

 

ভুলের স্বাদে এক বাটি সুখ

রাতের খাবারের সময়টুকু আমাদের পরিবারের কাছে ছোট্ট এক মিলনমেলা। সারাদিনের কাজ, পড়াশোনা, ব্যস্ততা শেষে সবাই একসঙ্গে বসি খাবার টেবিলে। কিন্তু সেদিনের রাতটা ছিল একটু অন্যরকম।
আমি তাড়াহুড়ো করে রান্না গুছিয়েছিলাম। ফ্রিজে ছিল কোরবানির ঝুরা মাংস, আর বিকেলে বানানো কয়েকটা চপ। মনে হলো, এগুলো দিয়েই রাতের খাবার হয়ে যাবে। কিন্তু খেতে বসেই আমার স্বামী মুখ কুঁচকে বলল,
 "সব খাবারই তো শুকনো! এতদিনেও বুঝলে না, আমি শুকনো খাবার খেতে পারি না?"
কথাটা শুনে আমার একটু খারাপই লাগল। সত্যি বলতে কী, বিষয়টা আমার মাথায় আসেনি। কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এল টেবিলে। আমি ভাবছিলাম, এখন আবার নতুন করে কী রান্না করব!
ঠিক তখনই পাশের বাড়ির রহিম চাচা এসে দরজায় দাঁড়ালেন। গ্রামের মানুষ, গল্প করতে খুব ভালোবাসেন। আমাদের মুখের ভাব দেখে হেসে বললেন,"কী ব্যাপার? সবাই এমন চুপচাপ কেন?"
ঘটনা শুনে তিনি হো হো করে হেসে উঠলেন।
 "আরে, এত চিন্তা কিসের? ভাতে পানি ঢেলে পান্তা বানাও। ঝুরা মাংস, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ-দেখো না কী মজা হয়!" কথাটা শুনে আমার স্বামীও যেন একটু নড়ে চড়ে বসল।
আমি গরম ভাতের মধ্যে ঠান্ডা পানি ঢেলে দিলাম। পেঁয়াজ কুচি করলাম, কাঁচা মরিচ কেটে নিলাম। ঝুরা মাংসগুলো ছুরি দিয়ে আরও ছোট ছোট করে কেটে একটা বাটিতে সাজালাম।
স্বামী প্রথম লোকমাটা মুখে দিয়েই বলল,"আরে! এটা তো বেশ মজার!"
আমাদের দুই মেয়ে, মিতলি আর তিতলি, অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল।
মিতলি বলল,"বাবা, তুমি তো একটু আগেও রাগ করছিলে!"
তিতলি সঙ্গে সঙ্গে বলল,"আমরাও খেয়ে দেখি!"
তারপর শুরু হলো নতুন উৎসব। চারজনের প্লেটেই পান্তা ভাত, ঝুরা মাংস, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ আর এক চিমটি লবণ।
খেতে খেতে রহিম চাচা বললেন,
 "এই খাবারের আসল কদর জানে নদীর পাড়ের মানুষ।"
আমার স্বামী হেসে বলল,"ভোলার লোকেরা তো পান্তার সঙ্গে যা পায় তাই খেয়ে আনন্দ করে।"
আমি যোগ করলাম,"বগুড়াতেও দেখেছি অনেকেই এভাবে খায়।"
মিতলি বলল,"তাহলে আমরা আজ ভোলা আর বগুড়া দুই জায়গার মানুষ হয়ে গেলাম!"সবাই হেসে উঠলাম।
সেই রাতের খাবার ছিল খুব সাধারণ। কোনো দামি পদ ছিল না, কোনো বিশেষ আয়োজনও ছিল না। অথচ সেই খাবারের স্বাদ আজও জিভে লেগে আছে। কারণ স্বাদটা শুধু পান্তা ভাত বা মাংসের ছিল না, ছিল একসঙ্গে বসে হাসার, ভুলকে আনন্দে বদলে ফেলার।
সেদিন আমি একটা ছোট্ট শিক্ষা পেয়েছিলাম। জীবনে সব ভুল খারাপ নয়। কিছু কিছু ভুল আমাদের নতুন পথ দেখায়, নতুন স্বাদ দেয়, নতুন স্মৃতি তৈরি করে।
আমরা প্রায়ই ভুলকে ভয় পাই, ভুলের জন্য আফসোস করি। অথচ অনেক সময় সেই ভুলই আমাদের এমন এক আনন্দের কাছে নিয়ে যায়, যা পরিকল্পনা করে কখনো পাওয়া যায় না।
আজও যখন পান্তা ভাত দেখি, আমার সেই রাতটার কথা মনে পড়ে। মনে হয়—
জীবনের সব হিসাব ঠিকঠাক হলেই যে সুখ আসে, তা নয়। কখনো কখনো একটু ভুল, একটু অগোছালো অবস্থা, আর একটু তাৎক্ষণিক বুদ্ধিই তৈরি করে সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি।
সেদিনের রাতের নাম যদি দিতে হয়, আমি বলব-
"ভুল থেকে জন্ম নেওয়া এক বাটি সুখের পান্তা।" 

*নন্দিনী লুইজা*
কবি, লেখক, কলামিস্ট, প্রকাশক ও সমাজকর্মী

Post a Comment

0 Comments