বিপুল চন্দ্র রায়
রাজারহাট, কুড়িগ্রাম,বাংলাদেশ।
বেটি ‘অর্পণা’র বিয়া ঠিক হইছে উলিপুরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলের সাথে। ছেলে সরকারি চাকরি করে, ঘরবাড়িও সউগ ভালো। রাজারহাটের বিনোদবাবু তার একনা বেটি ‘অর্পণা’র বিয়ার আয়োজন নিয়া খুব ব্যস্ত। সনাতন ধর্ম মতে পঞ্জিকা দেখি বিয়ার দিন-ক্ষণও ঠিক হইছে। কিন্তু বিনোদবাবুর মনের ভিতর শান্তি নাই।
ছেলের বাপ, উলিপুরের একজন নামকরা ব্যক্তি গিরিধারী রায়। মুখের উপর কয়া দিছে, বিনোদবাবু, হামরা তো আর কিছু চাই নাই, তোমার বেটির সুখের লাগি খালি গয়নাপাতি আর নগদ বিশ লাখ টাকা আর একটা লাল পালসার বাইক যেন থাকে। বিয়াই মানুষ, মান-সম্মানের কতাটা তো বুঝেন?
বিনোদবাবু মাথা নিচু করি আমতলাত বসি আছে।পাশের বাড়ির হিরু কাকা আসি কইল, কিরে বিনোদ, মুখখান এমুন করি আছিস ক্যানে? বিয়ার তো আর কয়দিন আছে! বিনোদবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি কইল, কি আর কমো হিরু কাকা? কপালটা মোর পুড়ি গেইল। গিরিধারী রায় যেমুনি করি যৌতুক চ্যাইছে, মুই অতো টাকা কোনটে পাইম? জমি-জমা যা আছিল সউগ তো আগোত বন্ধক থুইছোং।
অর্পণা মাও মোর সোনার মতন বেটি, কিন্তুক টাকার জন্য মানুষগুলা ওক পণ্য মনে করিছে।অর্পণা ঘরের কোনা থাকি সউগ শুনবার পাইছে। অর্পণার চোখ দিয়া টপটপ করি জল পড়িছে। সে মনে মনে ভাবল, হায়রে কপাল! হিন্দু ধর্মত বিয়া হইল পবিত্র বন্ধন। কিন্তুক এই যৌতুকের জ্বালায় বাবা মোর জ্যান্ত মরি যাছে। যে ঘরে টাকাই সউগ, সেই ঘরে মুই শান্তি পামো কোটে?
বিয়ার রাইত। সানাই বাজিছে। কিন্তু বিনোদবাবুর বুকত পাথর চাপা। গিরিধারী রায় মণ্ডপত বসি বারবার বাইকের চাবির জন্য হুংকার ছাড়িছে। অর্পণা তখন লাল শাড়ি পিন্দি আগুনের সামনে বসি আছে। পুরোহিত মন্ত্র পড়িছে—
“যদেতৎ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম, যদিদং হৃদয়ং মম তদস্তু হৃদয়ং তব।”
কিন্তু অর্পণার মনে হইল, এই মন্ত্রর চেয়ে যৌতুকের দেনা-পাওনার শব্দগুলা বেশি জোরে শোনা যাছে। সে বুঝল, তার এই নতুন জীবনের শুরুটা ভক্তি দিয়া না, বরং বাবার চোখের জল আর ঋণের বোঝা দিয়া হইছে।
বিনোদবাবুর আন্ধার ঘরে কেবল দীর্ঘশ্বাস ঘুরি বেরাইছে।বিনোদবাবুর ভিটা এ্যালা শ্মশান। বেটির বিয়ার বিশ লাখ টাকা আর পালসার বাইকের শখ মিটপার গিয়া পৈত্রিক জমিটুকুও মহাজনের (পেটে) চলি গেইল। পাওনাদারের দরজায় দরজায় গালি আর অপমান সইতে সইতে বিনোদবাবুর মান-সম্মান ধুলোয় মিশি গেইছে। সউগ শোধ করিয়াও দেনা শোধ হয় না, কেবল সুদের বোঝা বাড়ে। এভাবেই হিন্দু পরিবারগুলা ধর্মের দোহাই আর লোকলজ্জার ভয়ে ঋণের জালে জড়াইয়া এক্কেবারে নিঃস্ব হয়া যাছে। একদিন পাড়ার সউগ মাইনষক ডাকি বিনোদবাবু কইল—ওহে সমাজ! বেটি কি অভিশাপ? মোর সোনার মতন বেটিটাক মুই পণ্য করি বেচিনু, তাও মোর শান্তি হইল না। এই যৌতুক নামের রাক্ষসটা মোর ঘর-দুয়ার সউগ খাইয়া ফেলাইল। খবরদার! ধর্মের দোহাই দিয়া তোমরা আর কারো বাপের বুক খালি করিয়েন না। দেনার দায়ে মুই তো মরি গেনু, কিন্তুক তোমরা নিজের বিবেকটাক বাঁচায় রাখেন। সগাই এই যৌতুক এর বিরুদ্ধে রুখে দিন তা না হলে সামনে আরো খারাপ দিন গুণতে হবে।
আসুন, ধর্ম আর লোকলজ্জার দোহাই ছেড়ে আমরা মানুষ হই, বিনোদবাবুর মতন আর কোনো বাবাকে যেন ভিটেমাটি ছেড়ে নিঃস্ব হয়ে বিদায় নিতে না হয়।
0 Comments