শেষপাতার আলো
জয়শ্রী দাস
শরৎ শেষ হতে না হতেই গ্রামের চারদিকে কুয়াশার চাদর নেমে এসেছিল। ছোট্ট মেয়ে তিথি প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে সেই কুয়াশার ভেতর দিয়েই হাঁটত। ওর বাবা দিনমজুর—অনেক কষ্টে তিথির পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবু তিথির চোখে সবসময়ই স্বপ্নের ঝিলিক।
একদিন স্কুলে বিজ্ঞান–প্রদর্শনী হবে ঘোষণা এল। তিথি ঠিক করল, সে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে একটি মডেল তৈরি করবে। কিন্তু সমস্যা হলো—মডেল বানাতে খরচ লাগবে। তিথি দ্বিধায় পড়ে গেল। বাবাকে আর বোঝা বাড়াতে চায় না।
সেই রাতেই বাবা তিথিকে বললেন,
“স্বপ্ন দেখার অধিকার যার আছে, তাকে ধরা দিতে আমিও প্রস্তুত।”
বাবার কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিথি পুরনো কাচ, ভাঙা টর্চের ব্যাটারি আর ফেলে দেওয়া তার দিয়ে নিজের মতো করে মডেল বানাতে শুরু করল।
প্রদর্শনীর দিন স্কুল মাঠে ভিড়। বড় বড় মডেলের ভিড়ে তিথির ছোট্ট সৌরবিদ্যুৎ-যন্ত্রটি তেমন দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল না। কিন্তু বিচারক যখন জিজ্ঞেস করলেন, “এত কম খরচে কীভাবে?”—তিথি হেসে বলল,
“আলো তো আকাশ থেকেই আসে, আমি শুধু ওকে ধরার চেষ্টা করেছি।”
সবাই অবাক। বিচারকরা তিথির সৃজনশীলতা ও অধ্যবসায়ের প্রশংসায় ভরে উঠলেন। শেষমেশ ঘোষণা এলো—তিথিই প্রথম হয়েছে।
ট্রফি হাতে নিয়ে তিথি বাবার দিকে তাকাল। বাবা চোখ মুছছেন, তবু ঠোঁটে গর্বের হাসি। তিথি দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
“বাবা, আমার আলোটা তুমি।”
কুয়াশা সেদিনও ছিল, তবে তিথির চোখে তখন নতুন দিনের উজ্জ্বল ভোর।
0 Comments