হক কথা
উত্তম কে. বড়ুয়া এক যে ছিল মহারানি। নাম তার যমবুড়ি। তার পিতামাতা কেন যে ও নামটা রেখেছিলেন তা কারও জানার কথা নয়। তবে বর্তমানে তার নামটার স্বার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি যাকে ধরেন তার মাথা না খেয়ে ছাড়েন না। আর যার দিকে তার নজর সে পথভ্রষ্ট না হয়ে উপায় নেই। তিনি না খান এমন কোনো দ্রব্য দুনিয়ার বুকে বিরল। ভাত, মাছ, দই, দুধ, মোল-মুড়ি, মাংস, গোসত, সুরা-মদ, এমনকি জাত-কুল, মান-ইজ্জত পর্যন্ত খেতে পারেন তিনি। আবার উপদেশ দিতেও তিনি ভারী ওস্তাদ। প্রায় সময় তাকে বলতে শোনা যায়, আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শিখাও।" রানির মতোই কথা, এতে কোনো সন্দেহ নেই। উনার দু'একটা বাণী নিম্নে তুলে ধরছি- আমি যাহা বুঝি তাহা তোমাদের বলি ধন্য তোমরা করো মোরে মম আদর্শে চলি। পড়তে শিখো, কাজ শিখো, শিখো চলাফেরা ভাল-খারাপ মিলতে হবে আদেশ আমার কড়া। এখন আমি তোমাদের বলতেছি যাহা নির্দ্বিধায় তোমরা সবে গ্রহণ কর তাহা। থাকবে না কোনো দলাদলি থাকতে কোনো ধর্ম গাধা-ঘোড়া এক হবে হবে মহৎ কর্ম। ইউছুপ-জুলেখা আর লায়লী মজনু যাহা করেছিল তারা আমি গ্রহণ করিনু। চন্ডীদাস রজকিনী শিরিন-ফরহাদ তাদের তোমরা কভু দিয়ো না বাদ। দেশবাসীরাও উনার উপদেশ পালন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু রানির মনে বড় একটা দুঃখ। তিনি নিজে হক কথা বলেন। তার মতো হক কথা বলার মানুষ তিনি খুঁজে পায়নি। তাই একদিন মন্ত্রীসভা ডেকে বসলেন আলোচনায়। অনেক কল্পনা-জল্পনার পর রাজ্যে ঘোষণা করা হলো, "যে ব্যক্তি হক কথা বলতে পারবে, তাকে বেশ কিছু পুরস্কৃত করা হবে।" দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়। কেহ সাহস করে আসে না। তারপর রানি আর একদিন বসলেন তার মন্ত্রীসভা নিয়ে। তার সেদিনের ভাষণের মূল মন্ত্রগুলো পাঠ করলেন- রাজ্য আমার এমন হবে থাকবে নাকো শৃঙ্খলা। পুরুষ থাকবে ঘোমটা দিয়ে নারী থাকবে চুল খোলা। বিছানা থেকে ওঠতে হবে সূর্য ওঠার পূর্ব দিন, আরো অনেক কথা আছে বলবো কি আর ঘোড়ার ডিম। ঠিক এমন সময় এক অদ্ভুদ লোকের আগমন ঘটে। তার হাতে জুতা, পায়ে মোজা, মাথায় লম্বা চুল তার উপর লম্বা এক টুপি, আর নাকে কানে দুল। এক মন্ত্রী জিজ্ঞেস করল, "এই পাগলা কী চাস? পাগলা বলবেন না কারণ আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। তবে তোর এ বেশ কেন? প্রয়োজন আছে। কী জন্য এসেছিস? আপনাদের পুরস্কারের কথা শুনে হক কথা বলতে। শুনে রানি খুব খুশি হয়ে ওঠলেন। বললেন, "তুমি হক কথা বলতে পারবে? উত্তর এলো, পারব তবে কী পুরস্কার দেবেন তা একটু শোনা দরকার। রানি বললেন, বেশ পুরস্কারের কথা ঘোষণা করছি, শুন- "যদি তুমি সব সময়, সব অবস্থায় হক কথা বলতে পারো তবে তোমাকে দশ ভরি স্বর্ণমুদ্রা দেওয়া হবে।" শুনে সে বেশ খুশি হয়ে সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করে বলল, আপনারা সবাই শুনে রাখুন এবং সাক্ষী থাকুন, আমি যদি সব সময়, সব অবস্থায় হক কথা বলতে পারি তবে আমাদের কানী রানি আমাকে দশভরি স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দেবেন। সঙ্গে সঙ্গে রানি সিংহাসন থেকে ওঠে গর্জে উঠলেন। : কী বললিরে হারামির বাচ্চা? : হক কথা : কী রকম? : আপনার এক চোখে দৃষ্টি শক্তি নাইতো তাই। যাদের দু'চোখে দৃষ্টিশক্তি নাই তাদের বলা হয় অন্ধ, যাদের এক চোখে নাই তাদের বলা হয় কানা, আর তার স্ত্রীলিঙ্গ হলো কানী। সেই হিসাবে আপনি কানী রানি। : বেরো শুয়োরের বাচ্চা, বেরো--- : জানি আমাকে যেতেই হবে। কারণ জগতে হক কথা শুনার লোক নাই। রাজা বলেন আর রানি বলেন, ধনী বলেন আর গরিব বলেন, কেহ হক কথা পছন্দ করে না। পুরস্কার না পাই। আমি হক কথা বলেই যাব। আসি হুজরাইন।
0 Comments