নীরবে চলে গেলে সংগ্রামী কবি বশিরুজ্জামান বশির

 

নীরবে চলে গেলে সংগ্রামী কবি বশিরুজ্জামান বশির 
জিল্লুর রহমান জিল্লু

দুঃখে যাদের জীবন গড়া তাদের আবার দুঃখ কি? দুঃখ কে জয় করার জন্য যিনি কলমকে সম্ভল করে এগিয়ে চলছিলেন তিনি হলেন সংগ্রামী কবি বশিরুজ্জামান বশির। ন্যায়ের প্রতিক, তুখোড়, গণমানুষের পক্ষে প্রতিবাদী কবি হিসেবেও আমরা তাঁকে চিনি। নব্বই দশক থেকে শুরু করে আপসহীন ভাবে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছেন কবি বশিরুজ্জামান বশির। ঝাকড়া চুলের বাবরী ওয়ালা নিরঅহংকার, নির্লোভ, নির্ভেজাল সাহিত্য অঙ্গনের এক সাদা মনের মানুষ কবি বশিরুজ্জামান বশির। তিনি একাধারে কবি, লেখক, সম্পাদক, প্রকাশক, পরিচালক।

১২ মাঘ ১৩৮০ সাল, ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে বরিশাল জেলার কোতোয়ালী থানার ৭নং চরকাউয়া ইউনিয়নের পেটকাটা গ্রামে মুন্সী বাড়ি জন্মগ্রহণ করেন। পিতাঃ মরহুম রসুল আলী মুন্সী, মাতাঃ রওশন আরা বেগম মিনারা, সহধর্মিনী আছিয়া বেগম আদুরী, সন্তানঃ খাদিজা আক্তার শিউলী, মোহাম্মদ রিয়াজ মুন্সী, মোহাম্মদ রাহিম মুন্সী, মোহাম্মদ রাতুল মুন্সীকে নিয়ে মায়ের ভিটা কবি নিবাস, সামিট গেইট, পশ্চিম রূপাতলী, গ্যাস্টারবাইন সড়ক, বরিশালে স্থায়ী ভাবে বসবাস করেন। লেখাপড়াঃ অষ্টম শ্রেণী, ঝালকাঠি সরকারি শিশু সনদ (এতিমখানা)।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সবাই দুখু মিয়া নামে জানি। তারই মতো আর এক দুখু মিয়ার জন্ম আমাদের বরিশালে। ১৯৮০ সালে আগে বা পরে কবি বশিরুজ্জামান বশির এর বাবা রসুল আলী মুন্সী মৃত্যুবরণ করায় মা রওশন আরা বেগম মিনারা অসহায় হয়ে পরেন। কবি বশিরের মা জীবিকার সন্ধানে শিশু সন্তানকে নিয়ে বরিশালে চলে আসেন। ১৯৮১ সালে তার মা শিশু সন্তান বশিরকে বরিশাল জর্ডন রোড়ে ওয়াইএমসি নামক একটি খ্রিস্টান মিশন স্কুলে বিনা বেতনে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করেন। দ্বিতীয় শ্রেণীতে সে প্রথম স্থান অধিকার করেন সেখানে দ্বিতীয় শ্রেণীর পর লেখা পড়ার ব্যবস্থা না থাকায় ঝালকাঠি জেলার সরকারি শিশু সনদ এতিমখানায় আবার তাঁকে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত প্রথম স্থান লাভ করনে। লেখা পড়ায় মেধাবী হলেও ১৯৮৯ সালে এতিম খানায় অষ্টম শ্রেণীতে ২য সাময়িক পরীক্ষা দিয়ে পড়া লেখা সমাপ্তি করে বাড়িতে চলে আসেন। এখান থেকেই শুরু হয় জীবন যুদ্ধের অগ্রযাত্রা। কবি মনের দুঃখে বলেন-

 

‘‘মা, আছিয়ারা যেখানে আছে

ওদের সেখানেই থাকতে বলো;

পানতা ভাত আর কচুশাক খেয়ে

আছিয়ারা বেশ ভালো আছে!

মা, বিশ্বাস কর........

আমরা আজও স্বাধীনতা পাইনি।

একমুঠো ভাতের নাম আছিয়ার ঈদ

আছিয়ার গণতন্ত্র, আছিয়ার স্বাধীনতা’


১৯৮৯ সালে ৫০০ টাকা নিয়ে সাগর লঞ্চে মাত্র ১০ টাকায় ঢাকা চলে আসেন। ভাগ্যের কি পরিহাস লঞ্চে বসেই পকেট মার একমাত্র সম্বল ৫০০ টাকা পকেট কেটে নিয়ে যায়। ঢাকায় কোন আত্মীয় না থাকায় তাকে অনেক দিন রাস্তায় রাত যাপন করতে হয়েছে। আলো ঝলমলে ঢাকায় প্রথম এসে রাতে গুলিস্তান বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের বারান্দায় রাত কাটান। ঐ রাতেই তার হাতের ব্যাগসহ জামা কাপড় চোরে নিয়ে যায়। একটু মাথা গোঁজার ঠাই চাই তাইতো এক জামা কাপড়ে প্রথমে শ্যামবাজার ঠেলা গাড়ির হেল্পার, সুত্রাপুরের ব্রীজে রিক্সা চালান দুই মাস। পেটের ক্ষুদায় করতে হয়েছে নরসুন্দরের কাজ। অনেক দিন গুলিস্তান থেকে গাবতলী পায়ে হেটে দোকানে দোকানে কাজ খোঁজেন কোথাও কাজ মেলেনি। এই শহর বড়ই বিচিত্র। এখানে কেউ কারো আপননয় সবাই শুধু ছুটছে অর্থের পিছে কারো মনে মায়া নেই, মমতা নেই। মায়ের মন কাঁদে নিভৃতে। অনেক দিন ছেলের খবর না পেয়ে ছুটে আসেন ঢাকায়। অনেক খুঁজতে খুঁজতে গাবতলী বাস টার্মিনালে দেখা মেলে মা-সন্তানের। মায়ের পরিচিত ঢাকা গেন্ডারিয়া একজন অবসরপ্রাপ্ত দারোগার ছিল। সেই দারোগার সহযোগিতায় বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে টিয়ে পাখি দিয়ে অন্যের ভাগ্য গণনার কাজে নিয়োজিত হন। নিজ ভাগ্যচাকা ঘুরাতে যাত্রা। একই কাজে ৬ মাস পরে একটি চক্রে পরে চলে যান কুমিল্লা দাউতকান্দিতে সেখান থেকে দুই বছর পর আবার ফিরে আসের ঢাকায়। ১৯৯২ সালে ঢাকায় মোহম্মদপুর টিক্কা পাড়াতে ১৬০ টাকায় বস্তিতে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে শ্যামলী এসওএস শিশু পল্লী এতিম খানায় একই ব্যবসা মানুষের ভাগ্য গণনা শুরু করেন। অনুমতি না নিয়ে ফুটপাতে ব্যবসা করার অপরাধে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়। তার পক্ষে কোন লোকজন ও ঢাকা না থাকায় ১০ দিন জেল খাটতে হয় তাকে ঢাকা কেন্দীয় কারাগারে। এখানেই সমাপ্তি ঘটে অন্যের ভাগ্য গণনার কাজ।

এতিমখানায় থাকাকালীন ৮৮ এর বন্যা তাকে মর্মাহত করে।দারিদ্রের কশাঘাত তাকে দিন দিন খাটিঁ মানুষে পরিনত করে। সাধারণ মানুষের পক্ষে দাড়াঁতে তিনি কলম হাতে তুলে নেন। প্রচন্ড প্রতিবাদী কবির হৃদয়কে প্রতিনিয়ত তাড়া করে অসহায় মানুষের ছবি। তাইতো তিনি বলেন ‘দেশ ও মানুষের কল্যাণে অনেক কিছু লেখার ক্ষমতা আছে কিন্তু সংবাদপত্রের তা প্রকাশের ক্ষমতা নেই’। কবি তার স্বাধীনতা না পাওয়ার কাব্য-৮ এ বলেন


‘‘ডাস্টবিনের পাশে বসে

দিন-রাত কাঁদছ কেনো?

একান্ত উচিত ছিল আমার

শিশুটিকে প্রশ্ন করব;

অথচ শিশুটি উল্টো আমাকে

প্রশ্ন করল, এখানে কী চান?

আমরা কি স্বাধীনতা টোকাই!’’


কবির লেখালেখি শুরু ১৯৮৮ সালে ‘গরীরেব স্বপ্ন’ শীর্ষক একটি চলচিত্র কাহিনী দিয়ে এরপর তিনি অসংখ্য কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গান, উপন্যাস রচনা করেন, লেখালেখির পাশাপাশি প্রকাশনার কাজও করেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ প্রায় ১৫টি। সম্পাদিত গ্রন্থ ৩৫টি তার মধ্যে ‘আমার সেই মুক্তিযোদ্ধা’, ‘আবার আমরা যুদ্ধে যাব’, ‘বাংলার মাটি ছাড়’, ‘স্বদেশ জরিপ’, ‘আলোচনা শেষ এখন শুধুই স্বপ্ন দেখার পালা’, ভূমিহীন প্রেমিকের স্বপ্ন’, ‘ভূতের পাঠশালা’, ‘বাদশার বাদশাহী’, ‘রাতুল মামা ভূত চোর’, ‘একদিন তুমি কাদবে’, ‘বন্ধু হতে চাই’ ‘কাছে এসে বলো’, ‘পিংকির বিড়াল রহস্য’, ‘এইডস প্রতিরোধের ছড়া’, ছড়ায় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ’, ‘এসিড সন্ত্রাস প্রতিরোধের ছড়া’, `পিয়াজের গণতন্ত্র’ উল্লেখযোগ্য । তিনি মাসিক ‘সময় আনন্দ’, ‘সরল সময়’ এবং ছোটদের মাসিক ‘কিশোর কলম’, ‘মাসিক সময় উত্তম’, ‘মাসিক সরল প্রকাশ’, ‘মাসিক নারীশ্রম, ‘মাসিক ধাননদীখাল’, ‘ত্রৈমাসিক নতুন কৃষক’, ‘সময় আনন্দ’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তিনি ‘দেড় সতিনের ঝগড়া’ নামে একটি কমেডি এ্যালবাম পরিচালনা করেন। তার ১টি প্রকাশনা রয়েছে ‘রাতুল গ্রন্থপ্রকাশ’। এছাড়া ‘কিশোর কলম’ ও কবি বশিরুজ্জামান সাহিত্য পরিষদসহ চারটি প্রতিষ্ঠান থেকে বই প্রকাশ করেন। তিনি আর্তমানবতার সেবা প্রদানে লক্ষ্যে ‘কবি বশিরুজ্জামান বশির ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্টা করেন। মানবসেবার জন্য তিনি ‘পারিজাত মানবিক উন্নয়ন সংস্থা’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। এছাড়া তিনি কবি বশিরুজ্জামান বশির সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রতি বছর নতুন নতুন লেখক তৈরি এবং উৎসাহ দিতে ২৫ জানুয়ারি তার জন্মদিনে ১০ জনের মাধে প্রদান করে ‘কিশোর কলন সাহিত্য পুরস্কার’।

বই ছাপার পেশায় নেমে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করনে। এখন নিজে বই লেখেন, নিজেন এবং অন্যের বই ছাপানোই তার প্রতি দিনের কাজ। কবির বেঁচে থাকার সংগ্রাম কি কোন দিন শেষ হবার নয়? এই মানুষটি ইসলামের বানী ‘ধনীর সম্পদে রয়েছে গরীবের অধিকার’ এই শ্লোগান দিয়ে গড়ে তুলেন বশিরুজ্জামান বশির সাহিত্য পরিষদ। এর প্রকাশনার লাভের ২৫ ভাগ মানব কল্যাণ সেবামূলক কাজে ব্যয় করেন।

কবি ২০ জুলাই ২০২৩ তাঁর সন্তানতুল্য লক্ষ লক্ষ টাকার বইয়ের ভান্ডার হারানোর বেদনায় প্রথমবার ব্রেইনস্ট্রোক করে ঢাকা শ্যামলির বাসায়। প্রায় আড়াই বছর অসুস্থ থেকে ৫০ বছর বয়সে ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন।


কবি বশিরুজ্জামান বশির আপদমস্তক সাহিত্যপ্রেমিক ছিলেন। তার প্রতিটি লেখা আমাকে মুগ্ধ করে। প্রচার বিমুখ এবং তোষামদি বিরূপ যথার্থ মূল্যায়ন পাননি। আমাদের সাহিত্য অঙ্গনে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাবকে।‘ভুমিহীন প্রেমিকার স্বপ্ন’ একদিন সফল হবেই হে কবি তোমাকে জানাই সালাম।

Post a Comment

0 Comments