টুনটুনির পাঠশালা - এম আব্দুল হালীম বাচ্চু

 

টুনটুনির পাঠশালা
-এম আব্দুল হালীম বাচ্চু

রূপসী মহল্লার এক্কেবারে শেষ মাথায় একটি জায়গা আছে, যার নাম হালুয়াঘাটা মোড়। যেখানে রাস্তা এসে থেমে গেছে, সামনে অথবা পেছনে এগোনোর মতো আর কোনো রাস্তা নেই। সেখানে আছে কয়েকটি পুরনো কড়ই গাছ আর একটা বুড়ো বটগাছ; তারা যেন দাঁড়িয়ে আছে নীরব প্রহরীর মতো। ঠিক সেই থেমে থাকা জায়গাতেই গড়ে উঠেছে টুনটুনির শিক্ষণীয় এক পাঠশালা।
বাইরে থেকে দেখলে এই পাঠশালাকে খুব সাধারণ মনে হয়। টিনের চাল, অমসৃণ দেওয়াল, ভাঙাচোরা কয়েকটি বেঞ্চ! কিন্তু ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায় এটা কোনো সাধারণ পড়ার ঘর নয়; এখানে অক্ষরের চেয়ে প্রশ্ন বেশি, নিয়মের চেয়ে বাস্তবতা বেশি, আর মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে বোঝাপড়া অনেক গভীর।
টুনটুনি বয়সে ছোটো; কিন্তু তার চোখে আছে এক ধরনের জাগ্রত সতর্কতা। সে খুব জোরে কথা বলে না; অথচ তার যেকোনো কথা দীর্ঘদিন মাথার ভেতরে জমা থাকে। তার বাবা একসময় সরকারি অফিসের ক্লার্ক ছিলেন। অবসরের পর এলাকায় মানুষ ঠাট্টা করে তাঁকে বলেন-- তিনি নাকি “সব দেখেও কিছু না দেখার কৌশলে সিদ্ধহস্ত।" টুনটুনি তার বাবার কাছ থেকেই জেনেছে, এই সমাজে কখন চোখ বন্ধ রাখতে হয়, আর কখন চোখ খুলে তাকাতে হয়, আসলে এটা জানা খুব জরুরিও বটে।
পাঠশালার বেঞ্চগুলো এসেছে রূপসী সরকারি প্রাইমারি স্কুল থেকে আর বোর্ডটা এসেছে রশিদ স্যারের কোচিং থেকে-- এখনো তার গায়ে পুরনো দিনের দাগ রয়ে গেছে। এখানে যারা শিক্ষক তাঁরা কেউ স্থায়ী নন। যে যেদিন জীবনের ভার একটু নামিয়ে রাখতে পারে, সেদিনই সে স্যার। রিকশাচালক নুরুল শেখান রাস্তার হিসাব, মুদি দোকানি মান্নান শেখান বাকির ভেতরের ফাঁকির ফাঁক আর অবসরপ্রাপ্ত গফুর মিয়া শেখান, কীভাবে পেনশনের ফাইলে ধুলো পড়ে! প্রথম দিনের পাঠ খুবই ছোটো ছিল।
টুনটুনি বোর্ডে লিখে রেখেছে,-- “লাইন মানে সোজা নয়, লাইন মানে বাঁকা” তারপর সে আর কিছুই লেখেনি। ঘরের ভেতর কিছুক্ষণ নীরবতা ছিল। নুরুল স্যার শেষে বলেছিলেন,--“এই বাঁকাটাই সোজা করা সবচেয়ে দুঃসাধ্য।”
পরের দিন পাঠ ছিল অফিস-আদালতের ভাষা নিয়ে। সেখানে কথার মানে একরকম, কাজের মানে আরেকরকম। ফাইল চলে না, যতক্ষণ না তার পেছনে কোনো অদৃশ্য হাত কাজ করে! রশিদ স্যার ধীরে ধীরে বলছিলেন,-- “এই সমাজে ওজন মাপা হয় টাকায়, কিন্তু তার ছায়া পড়ে পেছনের ক্ষমতায়।”
একদিন পাঠশালায় হঠাৎ করে এলেন এক ভদ্রলোক। পোশাক পরিচ্ছন্ন, কথায় সমাজ আর দেশের ভার। তিনি নিজেকে পরিচয় দিলেন সমাজসেবক হিসেবে। টুনটুনি তখন শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করেছিল,-- “আপনি কি মানুষের পাশে দাঁড়ান, না কি মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলেন?” ভদ্রলোক উত্তর দেননি। তাঁর নীরবতাই যেন তার নিজের পরিচয় বহন করছিল!
এই পাঠশালায় মেয়েরাও আসে। তারা শেখে-- ভালো হওয়া জরুরি, কিন্তু নিজের অস্তিত্ব না বাঁচাতে পারলে সেই ভালোত্বই শিকল হয়ে যায়। ছেলেরা শেখে-- শক্ত হওয়া মানেই দাপট নয়; কখন নীরব থাকতে হয়, সেটাও শক্তিরই এক ভাষা।
আরেকদিন হঠাৎ তিনজন পুলিশ এসে দাঁড়ালেন। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। পুলিশ বোর্ডের লেখা বাক্যগুলো পড়তে থাকলেন-- “আইন সবার জন্য সমান; কিন্তু সবাই সমান নয়।” তিনি মৃদু হেসে বললেন,-- “এই কথাটা সবাই জানে, কিন্তু খুব কম মানুষ তা স্বীকার করে।” টুনটুনি তখন বোর্ডের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল "আসলে সত্য সবসময় বেশিদিন টেকে না।" সময় গড়িয়ে যায়। একদিন পাঠশালার ঘর ভেঙে পড়ে। বেঞ্চগুলো এখন অন্য কেউ ব্যবহার করছে, বোর্ডটাও হারিয়ে গেছে। কিন্তু পাঠশালাটা হারায় নাই। সেটা রয়ে গেছে মানুষের মাথার ভেতর, সিদ্ধান্তের ভেতর, আর কখনো কখনো অপরাধবোধের ভেতর।
শেষদিন টুনটুনি বলেছিল-- “এই পাঠশালা কোনো ঘর নয়। এটা একটা চোখ, যেটা একবার খুলে গেলে আর আগের মতো বন্ধ করা যায় না।” কারণ সমাজ বদলাতে হলে আগে সমাজটাকে চিনতে হয়; আর সমাজকে চিনে ফেললে দায়িত্ব কাঁধে এসে ভর করে এবং তখন সমাজের ভুলগুলোও চোখের ওপর ভাসে! আমরা ভুলকে মানব না, ভুলগুলোকে শুধরে নেব। জীবনের পাঠশালায় এটাই হোক সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা।
কাচারীপাড়া, পাবনা ৬৬০০

Post a Comment

0 Comments