বেদনার ফুল
আজহারুল ইসলাম আল আজাদ
শরতের মাঝামাঝি সময়।কাশফুল হাসছে। কাজল বিলে শালুক। বাবার বাড়ির সীমানা পেরিয়ে এখন সিমা স্বামী সংসার করছে। বেশ মাস খানেক হয়ে গেল। বাড়ীর উপর দিয়ে একটি কাক উড়ালেও সিমা মনে করে এটি বাবার দেশের কাক। আজ বাবার বাড়ির লোকজন সিমাকে নিতে আসবে। সেই বিকেল তে না হতেই প্রাচীরদের বাড়ীতে রান্না বান্নার আয়োজন চলছে । সেই শহর থেকে বাবুর্চি আনা হয়েছে,মাইল দুয়েক দূর থেকে রান্নার সুবাস নিঃশ্বাসের সুগভীর স্থানে ছড়াচ্ছে।
পাহাড়ীর ছেলে প্রাচীর। তিনি ছেলের বিয়েতে দশ হাজার লোককে খাওয়াবেন বলে দাওয়াত করেছেন। ঝর্না পাহাড়ীর স্ত্রী। তিনি বলেছিলেন বৌভাত করতে তবে কোন অর্থের বিনিময়ে নয়। তিনি তাই করলেন। তিনি বলেছেন বড়মেয়ে নেহার বিয়েতে কারোর হাত ভিজাতে পারেন নি তাই তিনি ছেলের বিয়েতে এত বড় আয়োজন করেছেন। দশ হাজার বলতে তাদের ওয়ার্ডে সাত হাজার খানা রয়েছে। প্রতি খানা থেকে একজন করে লোক এসে খাবে সেটি হিন্দু হোক আর মুসলমান হোক কোন টাকা পয়সা বা উপঢৌকন নেয়া হবেনা। হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায় পাহাড়ীকে ভালবাসে। তিনি কয়েকবারের চেয়ারম্যান ছিলেন। তা ছাড়া আরও একটি কারণ জরিয়ে আছে সেটি হলো বড়ভাই শৃঙ্গ মারা গেলো তার আবার কোন প্রকার রুহুরেছানি করা হয় নি। বিভিন্ন দিক চিন্তা করে পাহাড়ী এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিষয়টি জামাতা বাদল ও বিয়াই অসীম বাবুর সাথে পরামর্শ করেই করা হচ্ছে। সন্ধ্যায় বাবুর্চি রান্না উঠানোর জন্য রেডি । সাগর রতন তাঁরা মিয়া, আকাশ বাবুর্চিদের সাথে থেকে কাজে সাহায্য করার জন্য তালিকাভূক্ত। তারা খড়ির ঘর থেকে খড়ি নিয়ে আসছে। প্রতিবেশির কিছু ছেলে পুলে পানির দায়িত্বে আছে। ওরা পানির লাইন ক্লিয়ার করছে। কেউ আবার উনুনে খড়ি দেয়ার জন্য কাজ করছে। এসব সম্ভব হয়েছে বাদলের জন্য । পাহাড়ী ও ঝর্না তারা উনুনে আগুন ধরিয়ে দিল। বাবুর্চি রান্না শুরু করল। রাধতে হবে দশমন খাসীর মাংস। দুই মন ডাল, দশহাজার ইলিশ পিচের ভাজি, দশ হাজার চিকেন কাবাব, ও তার সাথে রাধতে হবে সাদা ভাত ও পোলাও। প্রথমে খাসীর মাংস উঠালেন। রান্না চলল। নিজ ওয়ার্ডের লোকজন সকাল দশটা থেকে দুপুর একটার মধ্যে খাবে। আত্মীয় দুপুরে খাবে। প্যান্ডেলে এক সাথে পাঁচশত লোকের বসার আয়োজন করা হয়েছে। দুইশত পঞ্চাশ জন পরিবেশকের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাতভর রান্না করা হলো। সকাল নয়টার মধ্যে সকল রান্না শেষ হলো। সকাল দশটা থেকে খাওয়া দাওয়া শুরু হলো। সিস্টেমে সব কাজ চলল। এক পর্যায়ে যেয়ে একটু সমস্যা হলো। এক ছেলে খেতে বসে আর একজন ছেলেকে মাংসের হার দিয়ে ঢিল ছুড়ে তাকে লাগেনি, সেই হাড় গিয়েছে আর একজনের খাবারের থলেতে পড়ায় সবাই অবাক এইটা নিয়ে বেশ মারামারির পর্যায় তৈরি হলে সুকৌশলে পাহাড়ী সাব সামাল দিলেন। পাহাড়ীসাব বুঝাতে সক্ষম না হলে আয়োজনটি ভন্ডুল করা হতো। ভাগ্যিস পাহাড়ী সাব বুঝতে পেরেছেন, তিনি দির্ঘদিনের প্রতি পক্ষকেও দাওয়াত করেছিলেন এই ঘটনায় তিনি ভেবে নিলেন শত্রুকে কখনো বন্ধু ভাবা ঠিক না। খেতে বসে মজা করে খেয়ে হাড় ছিটকায়ে শত্রুতা করল। দুপুর দুইটা পযর্ন্ত প্রায় আটহাজার লোককে খাওয়ানো সম্ভব হলো। দুইটার পর এলো সিমার বাবার বাড়ীর লোকজন ও আত্মীয় স্বজন। তারা সংখ্যায় প্রায় দুই হাজার হবে। তাদের চার টিপ খাওয়াতে চারটা বেজে যায়।সবার খাওয়া শেষ হলে সিমাকে তারা নিয়ে যাওয়ার জন্য তাগিদ দিলে,সিমা ও প্রাচীর সাথে বাদল ও ঢাকার বন্ধু বান্ধবরা সিমার বাবার বাড়ির দিকে রওয়ানা দিল । গ্রামের সবাই খেতে এল, খেল কিন্তু দুইজন চেনা শত্রু আসেনি। হয়ত আসবে। খাওয়ার ব্যপারে কেউ খারাপ কিছু বলেনি। ঠিকই ঐ লোকগুলো এল। তারা হলো পেচু ও তার দল। সঠিক সময় না আসে নি। দেরিতে আসায় তারা খেতে না পেরে গ্রামে কিছু বদনাম ছড়াল। তারা বিভিন্ন যায়গায় বলে বেড়াচ্ছে আমাদের দাওয়াত দিয়েছে কিন্তু খাওয়াতে পারেনি। মেম্বারের কাছে পেচুরা বলল, পাহাড়ী দাওয়াত দিলো কিন্তু খাওয়াতে পারল না । শামসু মেম্বার বলল, তোমরা কখন গেছিলে? পেচু বলল, বিকেল চারটার দিকে। তোমাদের দাওয়াতের সময় কখন ছিল? পেচু বলল, দুপুরে। মেম্বার রাগান্বিত স্বরে বলল, আমি সেখানে ছিলাম। এলাকার লোকজনের জন্য নির্ধারিত সময় ছিল সকাল দশটা থেকে দুপুর একটা। তারপরও তারা দুইটা পর্যন্ত খাওয়ালেন। চারটার সময় গেলেতো খাওয়াবে না।সেটা আমি হলেও তাই করতাম। জোকের মুখে যেন হুকোর পানি পরল। পেচুর মুখখানা চুপসে গেলো। মেম্বার সাব আরও বললেন, পেচু তুমি যে কার তা আমি জানিনা? তবে নিজের ভুলে অন্যকে দোষরোপ করা ঠিক নয়। ভাল হয়ে যাও পেচু! ভাল হতে পয়সা লাগেনা। পেচু নিশ্চুপ। ক্ষানিক পর সে কথা ঘোরানোর চেষ্টা করল কিন্তু কিছুতেই পারল না। মেম্বার সাব কিছুতেই সে সুযোগ দিল না। মেম্বার জানে এই সমাজে কিছু লোক আছে যারা রং বদলাতে পারে,তারা সকালে এক রং ধরে বিকেল অন্য রং ধরে। তাদের সংসার বলতে কিছু নেই। তারা সুবিধাবাদী। তাদের মা বোন বলতেও কিছু নেই। নিজে চলার জন্য যাকে যা বলে সুবিধা নেয়া যায়। তারা তাই করে। পেচুদের মত লোকের কথা কেউ এখন আর বিশ্বাস করে না। সকলেই জানে পেচু মানে ভেজাল। সিমাকে যারা নিতে এসেছিল তারা মুগ্ধ যে তাদের রিচিভশন থেকে খাবার মান পর্যন্ত ভাল ছিলো। এত লোককে খাওয়ানো হলো নেই কোন কথা, নেই কোন সময় বিলম্ব, নেই কোন ঘাটতি। সিমা ব্যাংকে যব করেন তার বিভাগের বড় বড় অফিসারগণ এসেছিলেন। তারা প্রকাশ্য বলে গেলেন, জীবনে তারা অনেক বিয়ে বাড়িতে গেছেন এ রকম সম্মান ও ব্যবহার জীবনে কোথাও পান নাই। তারা বেশ আনন্দ উপভোগও করেছেন। সিমা চলে যাওয়ার পর হঠাৎ পাহাড়ীর বুকের ব্যাথাটা বেশি হলো। বুক চেপে ধরে ঘরে গেলেন। ঝর্নাকে ডাকলেন,ঝর্না রান্না ঘরে ছিলেন। সব ফেলে চলে এলেন। পিছন পিছন জা সোহেলিও এলেন। পাহাড়ী বুক চেপে ধরে বললেন, ঝর্না কেন যেন আমার বুকটা ভেঙ্গে যাচ্ছে?তুমি আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে চলো। সোহেলি ফোন দিল সিমাকে। সিমা সবাইকে বলল গাড়ী ঘুরাই নেন, শুনেতো মাথা হ্যাং সবার। তারা গাড়ী ঘুরায়ে চলে এলেন। অসীম সাব বাইরে উনাকেও সংবাদ দেয়া হলো। তিনিও মোটর সাইকেলে ছিলেন। তিনি আবার ঘুরে এলেন। বাদল এসে বিলম্ব না করে গাড়িতে উঠালেন। সিমা সোহেলি, প্রাচীরসহ সকলেই দুইটা গাড়িতে জেলা সদর মেডিকেলে নিয়ে গেলেন। দুই বাড়ি এখন ফাঁকা। বাবুর্চি ও পরিবেশনকারীগন তখনও বিদায় হয়নি, তারা টাকার জন্য, কে বা কাউকে ফোন করার সাহস পাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে কিভাবে তারা টাকার কথা বলবে? ভেবে পাচ্ছে না। ডেকোরেটরের টাকাও বাকি রয়েছে। তারাও ফোন করার সাহস পাচ্ছেনা। দুই বাড়ির এক বাড়িতে অবস্থান করল বাবুর্চিগণ প্রাচীরদের বাড়ীতে থাকল ডেকোরেশনের লোকজন। ডেকোরেশন এর মালিক মোটর বাইকে মেডিকেলে পৌঁছিল। রোগীকে অক্সিজেন দেয়া হয়েছে। সিমা শশুরবাবার সামনে গেল এবং তার অবস্থা দেখে কান্না আটকাতে পারছিলো না। বাদল তাদের পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বলল, তোমরা বাড়িতে যাও কারন, এখনও যেহেতু বাবুর্চি ও পরিবেশকগন বিদায় হয়নি। আর এই দুই লক্ষ টাকা নিয়ে গিয়ে বাবুর্চিকে পঞ্চাশ হাজার পরিবেশকদেরকে একলক্ষ ও ডেকোরেটরের মালিক কে পঞ্চাশ হাজার দিও। পকেট থেকে দুই লক্ষ টাকা বের করে দিয়ে তাদেরকে বাড়িতে পাঠাল। তারা বাড়ি এসে দেখল। বাবুর্চি ও পরিবেশকদের একজন বাইরে বসে আছে। জিজ্ঞেস করল আপনারা দুইজন আর বাকিরা কোথায়? বাবুর্চি উত্তর দিলো সবাইকে চলে গেছে। আমরা আর কত সময় অপেক্ষা করব? তাছাড়া আমরাতো ফোন করতে পারছিনা। বিবেকে বাধছে। প্রাচীর তাদেরকে টাকা ভাগে ভাগে বুঝে দিলো।ডেকোরেশন এর লোককে ডেকে টাকা দিয়ে বলল, বাদল ভাই আপনাদের কোন টাকা বাকী থাকলে আগামীকাল বা পরশু ডেকে হিসেব করে দিবে। তারা টাকা পেয়ে চলে গেলো। তারামিশা ও আকাশ বাড়ি পরিস্কারের কাজে ন্যস্ত হলো। প্রাচীরদেরট বাড়ি পরিস্কার করা হলো। তারা দুজনে হাত পা ধুয়ে এলো। আকাশেট বড্ড ঘুম পাচ্ছে। বেশ কয়েকদিন থেকে ঘুম সেভাবে পাড়া হয়নি। তারামিয়া ও আকাশ একসাথে ঘুমাল। রাত তিনটায় প্রাচীর আকাশকে ফোন দিলে আকাশ বিছানা থেকে ঝেপে উঠল। তারামিয়াকে ডাকল। তাদের ঘুম ভাংলো। আকাশ বলল,ভাই ছোটবাবা মারা গেছে। বিছানা থেকে উঠে দুজনেই ঘরের বাইরে বের হলো। রাস্তায় গাড়ির বাতি দেখে তারা বাইরে অপেক্ষা করছে।গাড়ি দুটো এসে তাদের সামনে দাড়ালো। গাড়ি থেকে সবাই কাঁদতে কাঁদতে নামল। শেষে ট্রেচারে করে ছোটবাবার লাশ নামাল। অসীমসাব গাড়ি থেকে নামল। হতভম্ব হয়ে এক পার্শে দাঁড়াল। তিনি বড্ড কষ্ট পেয়েছেন। বিয়াই সাবের মৃত্যু তাকে আজও খাবলে খাবলে খাচ্ছে।এইতো কথা বলল, আর এখন লাশ। বেদনার অশ্রু গড়াচ্ছে কপোল বেয়ে। এই দুনিয়া ক্ষনিকের প্রাচীরকে দুইজন ধরে গাড়ি থেকে নামাল। প্রাচীর ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়েছে। তার জ্ঞান নেই। তার শরীরের উপর দিয়ে অনেক ধকল চলে যাচ্ছে।
মরহুম পাহাড়ীর একমাত্র মেয়ে নেহা গর্ভবতি, তার আজকে ইস্যুর ডেট। সেই সকাল থেকে তার পেট ব্যথা করছে, বাবার শোকের কারণে অনেকটা বেমালুক ভুলে গেছে, ঠিক গাড় থেকে নামার সাথে সাথে ব্যথা বেশী হলো, সিমা থাকে ঘরে নিতেই তার কোল জুড়ে আসল এক ফুটফুটে ফুল। একদিকে শোক অপর দিকে আনন্দ।প্রকৃতির অমোঘ খেলা। এ যেন বেদনার ফুল।
0 Comments